সারাবিশ্বে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল শান্তির ধর্ম ইসলাম।

0

ছবি: সংগৃহীত

জনপ্রচার বাংলাদেশ ইসলামিক ডেস্ক:


মানবজাতির মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঠিক ৪০ বছর বয়সে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত প্রাপ্তির পর তাঁর ওপর অর্পিত হয় এক মহান জিম্মাদারি—তা হলো পথভোলা মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে আহ্বান করা। তিনি তাঁর নবুয়তি জীবনের শুরুতেই নিজ বংশ কুরাইশদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।


তৎকালীন মক্কার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বড় বিপদের আশঙ্কা থাকলে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সতর্ক সংকেত দেওয়া হতো। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই নিয়ম মেনেই একদিন সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে উচ্চস্বরে ডাক দিলেন। তাঁর আহ্বানে কুরাইশ বংশের প্রতিটি গোত্রের মানুষ কৌতূহলী হয়ে সেখানে সমবেত হলো। আল্লাহর রাসূল তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "আমি যদি বলি এই পাহাড়ের অপর পাশে একদল শত্রু সৈন্য তোমাদের ওপর হামলার অপেক্ষায় আছে, তবে কি তোমরা তা বিশ্বাস করবে?" উপস্থিত সবাই একবাক্যে বলে উঠল, "অবশ্যই করব, কারণ আমরা আপনার মুখ থেকে আজ পর্যন্ত সত্য ছাড়া মিথ্যা শুনিনি।"


তখন রাসূল (সা.) অত্যন্ত আবেগভরে ঘোষণা করলেন, "আমি তোমাদের জন্য কিয়ামতের কঠিন আজাব সম্পর্কে সতর্ককারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।" তিনি একে একে বনু কাব, বনু আবদে মানাফ, বনু হাশেম ও বনু আবদুল মুত্তালিবসহ প্রতিটি গোত্রের নাম ধরে তাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার আহ্বান জানালেন। এমনকি নিজ কন্যা ফাতেমা (রা.) এবং ফুফু ছাফিয়াকেও (রা.) উদ্দেশ্য করে বললেন, নিজেদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে।


রাসূল (সা.)-এর এই হৃদয়স্পর্শী আহ্বান কুরাইশদের অনেকের মনে নাড়া দিলেও তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করল। সে অভিশাপ দিয়ে বলল, "তোমার ধ্বংস হোক! একারণেই কি আমাদের ডেকেছ?" এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ সুরা লাহাব নাজিল করেন, যেখানে আবু লাহাবের চিরস্থায়ী ধ্বংসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।


প্রকাশ্যে তাওহিদের দাওয়াত শুরু হওয়ার পর থেকেই কুরাইশদের সাথে বিরোধ চরমে ওঠে। তারা রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার শুরু করে। তাঁকে 'কবি', 'যাদুকর', 'উন্মাদ' এমনকি 'নির্বংশ' বলে গালিগালাজ করতে থাকে। কুরাইশ নেতারা অদ্ভুত সব দাবি পেশ করতে লাগল—ফেরেশতা নামিয়ে আনা, আকাশ থেকে ধনরত্ন বর্ষণ কিংবা কিয়ামতের সঠিক সময় বলে দেওয়ার মতো অযৌক্তিক তর্ক জুড়ে দিল। তাদের মূল ভয় ছিল, ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের বংশীয় আভিজাত্য ও নেতৃত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে।


কুরাইশদের বিরোধিতা কেবল গালিগালাজে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ক্রমে সহিংসতায় রূপ নেয়। রাসূল (সা.)-এর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা, সিজদারত অবস্থায় পিঠের ওপর পশুর নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া এবং সাহাবিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু হয়। মক্কাবাসীদের অনমনীয় মনোভাব দেখে একবুক বেদনা নিয়ে তিনি তায়েফে গমন করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি চরম অবমাননা ও পাথর বর্ষণের শিকার হয়ে রক্তাক্ত হন। তবুও তিনি তাদের জন্য বদদোয়া না করে হিদায়াতের দোয়া করেছিলেন।


অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। এই হিজরতই ছিল ইসলামের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। মদিনায় ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ, ন্যায়বিচার এবং অনুপম চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে।


পরবর্তী ১৪০০ বছরে ইসলাম কেবল আরবের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা পারস্য, রোম থেকে শুরু করে সিন্ধু নদ হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সাহাবিদের ত্যাগ এবং ওলামায়ে কেরামদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ইসলামের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বর্তমানে ইসলাম বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল এবং অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মমত। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আজ রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসা ও তাঁর প্রদর্শিত দ্বীন জীবন্ত হয়ে আছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/popular/default