শ্রমিক সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের উপস্থিত নেতৃবৃন্দ | ছবি: সংগৃহীত
জনপ্রচার বাংলাদেশ ডেস্ক:
মে দিবসের তপ্ত দুপুরে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম চত্বর আজ মুখরিত ছিল শ্রমজীবী মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে। শোষিত ও বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ইসলামি শ্রমনীতি ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে ২৩ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ।
শুক্রবার (১ মে) আয়োজিত এই বিশাল শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম এক যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি বলেন, “যুগ যুগ ধরে শ্রমিকরা শুধু ব্যবহারই হয়েছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। আমরা দাবি জানাই, প্রতিটি শ্রমিককে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ ‘শ্রমিক কার্ড’ দেওয়া হোক। এই একটি কার্ডের মাধ্যমেই যেন তাদের খাদ্য, উন্নত চিকিৎসা এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা হয়।
সমাবেশে উপস্থিত হাজার হাজার শ্রমিকের সামনে তাদের জীবনমান উন্নয়নে যে ২৩টি দাবি উত্থাপন করা হয়, তা নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের ২৩ দফা দাবি:
১. ন্যাজ্য মজুরি: নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সকল খাতের শ্রমিকের জন্য সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও কার্যকর করা।
২. নিরাপদ কর্মস্থল: কলকারখানা ও সকল কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. স্থায়ী নিয়োগ: ঠিকা বা চুক্তিভিত্তিক প্রথা বন্ধ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির স্থায়িত্ব ও আইনি বৈধতা প্রদান।
৪. শ্রম আইন প্রয়োগ: বিদ্যমান শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের ওপর যে কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করা।
৫. সামাজিক সুরক্ষা: শ্রমিকদের জন্য পেনশন স্কিম, উন্নত চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও জীবন বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা।
৬. সংগঠিত হওয়ার অধিকার: বাধা ছাড়াই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান এবং শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে হয়রানি বন্ধ করা।
৭. বাজার নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রাখতে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া।
৮. নারী শ্রমিকের অধিকার: বেতন বৈষম্য দূর করে সমান কাজে সমান মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৯. প্রবাসী সুরক্ষা: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশ গমন ও সেখানে অবস্থানকালীন আইনি নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা।
১০. ইসলামি শ্রমনীতি: সকল প্রকার শোষণ ও বৈষম্য দূর করতে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক ইসলামি শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করা।
১১. পরিবহন খাত: সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবহন শ্রমিকদের কাছ থেকে সব ধরনের চাঁদাবাজি ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা।
১২. গার্মেন্টস শিল্প: মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে বকেয়াহীন বেতন পরিশোধ এবং কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
১৩. হকারদের সুরক্ষা: হকারদের ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ না করে তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থায়ী জোন বা মার্কেট বরাদ্দ দেওয়া।
১৪. নির্মাণ শ্রমিক: ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সেফটি গিয়ার ও দুর্ঘটনা বীমা চালু করা।
১৫. হোটেল ও রেস্তোরাঁ: অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার অবসান ঘটিয়ে আট ঘণ্টা কাজ ও স্বাস্থ্যসম্মত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা।
১৬. দোকান শ্রমিক: নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটি এবং উৎসব বোনাসসহ শ্রম আইনের সব সুবিধা কার্যকর করা।
১৭. ভারী যানবাহন: ট্রাক ও বাস চালকদের লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করা এবং মহাসড়কে ডাকাতি ও হয়রানি বন্ধ করা।
১৮. ক্ষুদ্র যানবাহন: সিএনজি, রিকশা ও ভ্যান চালকদের আইনি বৈধতা দেওয়া এবং স্ট্যান্ডগুলোতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
১৯. কারিগরি শ্রমিক: ডেকোরেটর ও ফার্নিচার শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা।
২০. নৌ-শ্রমিক: জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামসহ নিরাপদ নৌযান নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
২১. রেলওয়ে: রেলের আধুনিকায়ন এবং এই খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের উন্নত আবাসন ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।
২২. হালকা যানবাহন: ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজি-বাইক চালকদের প্রশিক্ষণ ও সঠিক রুট পারমিট নিশ্চিত করা।
২৩. রাষ্ট্রীয় কার্ড ও সহায়তা: সকল পর্যায়ের শ্রমিকের জন্য সরকারি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে ‘শ্রমিক কার্ড’ প্রদান এবং যেকোনো সংকটে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা।
সমাবেশের বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এই ২৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে মে দিবসের চেতনা নিয়ে সারা দেশের মেহনতি মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।