সংসদ ভবন থেকে উধাও ১৩৪৩ কপার বার

0

ছবি: সংগৃহীত

ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক | জনপ্রচার বাংলাদেশ


রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ নিরাপদ ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবনের স্টোররুম থেকে ১ হাজার ৩৪৩টি মূল্যবান কপার বাসবার উধাও হয়ে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা তথ্যপ্রকাশ পেয়েছে। সরকারি হিসাব মতেই গায়েব হওয়া এই বিপুল পরিমাণ ভারী ধাতব সরঞ্জামের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। তবে সংসদ ভবনের মতো সুরক্ষিত স্থান থেকে কীভাবে এই বিশাল লট গায়েব হলো, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না গণপূর্ত অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা। উল্টো এই কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যাকডেটে (পেছনের তারিখে) একাধিক ভুয়া সার্ভে রিপোর্ট ও নথিপত্র জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।


সংসদ ভবন সূত্র ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে সংসদ ভবনের নবম তলার উপকেন্দ্রের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল উন্নয়ন কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্স কর্পোরেশন লিমিটেড। নিয়ম অনুযায়ী কাজ শেষে পুরোনো ও অবশিষ্ট ১ হাজার ৩৪৩টি কপার বার এমএমপি স্টোররুমে জমা থাকার কথা কাগজে-কলমে উল্লেখ করা হয়। তবে খোদ গণপূর্তের কর্মকর্তাদের একাংশের সংশয়— জুলাই আন্দোলনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের যোগসাজশে ভুয়া বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। আর নতুন সরঞ্জাম ব্যবহার না করে পুরোনো কপার বারই জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার করায় স্টোরে আদতে কোনো মালপত্র জমা-ই হয়নি। এই বড় অনিয়ম ঢাকতেই এখন কপার বার চুরির নাটক সাজানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন: অপরাধের বিরুদ্ধে ডিএমপি কমিশনারের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা
 

এদিকে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তদন্তের আগেই নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) আসিফ রহমান নাহিদ যৌথভাবে দায় চাপিয়েছেন মাত্র ৫ মাস আগে বদলি হয়ে আসা উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের ওপর। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি মাত্র কয়েক মাস এখানে ছিলাম। দীর্ঘ তিন বছর ধরে এসডি আসিফ রহমান এখানে আছেন। আমাকে কখনো সাইট বা স্টোরের প্রকৃত দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। মূলত বড় কর্মকর্তারা নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করতে আমাকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন।” ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নেতারাও প্রশ্ন তুলেছেন, সংসদের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার স্টোররুমের সিসিটিভি ক্যামেরা কেন রহস্যজনকভাবে নষ্ট রাখা হয়েছিল।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, জালিয়াতি ঢাকতে একই কাজের জন্য দুইবার সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে, যার একটির সাথে অন্যটির কোনো মিল নেই। প্রথম রিপোর্টে কোনো তারিখ বা স্বাক্ষর নেই এবং কিছু তথ্য কম্পিউটারের বদলে হাতে লেখা। দ্বিতীয় রিপোর্টে নিজের দায় এড়াতে তড়িঘড়ি স্বাক্ষর করেন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্স কর্পোরেশনের সিইও প্রকৌশলী নুরুন নবী সুজন জানান, তারা কাজ সম্পন্ন করলেও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করেছিলেন। সেই ঘুষ বা কমিশন না দেওয়ায় তাদের ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল কম দেওয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে তারা আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।


এই মেগা চুরির ঘটনায় গত ২৫ মার্চ একটি চার সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই সংসদ ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের সরাসরি দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালিকুজ্জামান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষদ মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন।

Tags:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/popular/default