এআই দিয়ে তৈরি করা | ছবি: সংগৃহীত
বিশেষ প্রতিবেদক | জনপ্রচার বাংলাদেশ
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসন, ভয়াবহ লবণাক্ততা দূরীকরণ এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে অবশেষে বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রথম ধাপের এই কাজ বাস্তবায়ন করবে। তবে এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, নদীর ভৌগোলিক পরিবর্তন, পলি ব্যবস্থাপনা এবং ভারত-সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি সুফল পাবেন। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে, যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট, নেভিগেশন লক, ফিশ পাস এবং একটি রেলসেতু। এর পাশাপাশি ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক এলাকায় দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—এই পাঁচটি নদীব্যবস্থাকে পর্যায়ক্রমে খনন ও রেগুলেটর নির্মাণের মাধ্যমে সচল করা হবে। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহীসহ ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবে, যার ফলে প্রায় ২৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হবে।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট চলছে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি হবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে এই প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
তবে এই বিপুল বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় দেখা দিয়েছে। বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রকল্পটি লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও ব্যারাজের উজানে ক্ষয় ও ভাটিতে পলি জমার মতো বড় পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের নকশা ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ছাড়া এই প্রকল্প সফল করা কঠিন।
অন্য দিকে, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ফারাক্কা বাঁধের উদাহরণ টেনে এক ভয়ানক বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ব্যারাজের উজানে পলি পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে। ফলে রাজবাড়ীর পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে ভয়াবহ বন্যা ও পাড়ভাঙন দেখা দেবে, ঠিক যেমনটি ফারাক্কার কারণে ভারতের বিহারে ঘটেছে। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে সরিয়ে নিলে দেশের মধ্যাঞ্চল ও মেঘনা মোহনায় পানির প্রবাহ কমে যাবে। এতে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদী শুকিয়ে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ততা দেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করবে।
অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে প্রকল্পটিকে একটি ‘বড় বাজি’ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ভারতের সাথে নতুন কোনো পানিবণ্টন চুক্তি ছাড়াই এই ব্যারাজ নির্মাণ করা মানে হলো নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। কারণ বাংলাদেশ যখন বিপুল টাকা খরচ করে এই অবকাঠামো তৈরি করবে, তখন ভারত জানবে যে এটি সচল রাখতে বাংলাদেশের পানির খুব প্রয়োজন। ফলে আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনায় বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে চলে যেতে পারে। যদি ভারত থেকে আশানুরূপ পানি না আসে, তবে এই বিশাল বিনিয়োগ কোনো কাজেই আসবে না।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশবাদী সংগঠন বাপা এবং বেন মনে করে, অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি হঠকারী পদক্ষেপ হবে। তাদের মতে, সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ব্যবহারবিষয়ক জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং তার ভিত্তিতে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো।