| ছবি: সংগৃহীত |
বান্দরবান প্রতিনিধি | জনপ্রচার বাংলাদেশ
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। নিজের পদের গাম্ভীর্য ভুলে শিক্ষকদের বেতন জোগাতে এবং শিক্ষার্থীদের পারাপারের জন্য নিজেই হাতে তুলে নিয়েছেন বোটের হাল। বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষকের এমন ত্যাগ ও পরিশ্রম এখন সবার মুখে মুখে।
কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে এমবিএ এবং কক্সবাজার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করা বামং খিয়াং মিংলেন চাইলে বেছে নিতে পারতেন আরামদায়ক কোনো ক্যারিয়ার। কিন্তু ২০২০ সালে তিন্দু গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন এক কঠিন সংগ্রামী জীবন।
বিদ্যালয়টির অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় সেখান থেকে নিয়মিত বেতন পাওয়া অসম্ভব। ফলে ৬ জন শিক্ষকের নামমাত্র সম্মানি দেওয়াটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত বোট নিজেই চালান মিংলেন। প্রতি শুক্রবার, শনিবার ও ছুটির দিনে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক বলেন, “অন্য চালক রাখলে তাকে মজুরি দিতে হয়, আবার অনেক সময় আয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তাই আমি নিজেই বোট চালাই যাতে প্রতিটা টাকা সাশ্রয় হয় এবং সেই টাকা দিয়ে শিক্ষকদের সামান্য বেতন হিসেবে দিতে পারি।” তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে পর্যটক পরিবহন করে তিনি প্রায় ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় করেছেন, যার সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে শিক্ষকদের বেতন হিসেবে।
শিক্ষক মিংলেন শুধু বাজারেই পর্যটক টানেন না, বরং সাঙ্গু নদী পার করে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়াও করেন নিজ হাতে। তার এই নিরহংকার মানসিকতায় মুগ্ধ সহকর্মীরাও। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাওয়ার ম্রো জানান, “প্রধান শিক্ষক নিজে খেটে যা আয় করেন, তা আমাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেন। এই সামান্য অর্থ দিয়েই আমরা কোনোমতে টিকে আছি এবং পড়ানো চালিয়ে যাচ্ছি।”
বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এই বিদ্যালয়ে। ২০২৩ সালে পাঠদানের স্বীকৃতি পাওয়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ভবন নির্মাণ করছে। থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে বিদ্যালয়টিকে টেকসই আয়ের উৎস হিসেবে এই বোট দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে।
অদম্য এই শিক্ষকের প্রচেষ্টায় পাহাড়ি শিশুদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ এখন নতুন আশার আলো দেখছে।