ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবার মোট ৩৮ জন মুসলিম প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ী এই আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ৩২ জনই ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) টিকিটে জয় পেয়েছেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে মুসলিম প্রার্থীদের এই জয় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে এবার যারা জয়ী হয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—কসবা আসন থেকে জাভেদ খান, কলকাতা বন্দর থেকে ফিরহাদ হাকিম, মেটিয়াব্রুজ থেকে আবদুল খালেক মোল্লা, জলঙ্গী থেকে বাবর আলি, হরিহরপাড়া থেকে নিয়ামত সেখ, শামশেরগঞ্জ থেকে মুহাম্মদ নূর আলম, ভরতপুর থেকে মুস্তাফিজুর রহমান এবং সাগরদিঘি থেকে বায়রন বিশ্বাস।
এছাড়া দেগঙ্গা আসন থেকে আনিসুর রহমান বিদেশ, হাড়োয়া থেকে আবদুল মাতিন, বসিরহাট উত্তর থেকে তৌসিফুর রহমান, ক্যানিং পূর্ব থেকে বাহারুল ইসলাম, মগরাহাট পশ্চিম থেকে শামীম আহমেদ, সুজাপুর থেকে সাবিনা ইয়াসমিন এবং বীরভূমের হাসন থেকে কাজল শেখ জয়ী হয়েছেন। একই দল থেকে আরও বিজয়ী হয়েছেন—চোপড়া থেকে হামিদুল রহমান, গোয়ালপোখর থেকে মো. গোলাম রব্বানী, চাকুলিয়া থেকে আজাদ মিনহাজুল আরফিন, ইটাহার থেকে মোশারফ হোসেন, কুমারগঞ্জ থেকে তোরাফ হোসেন মণ্ডল এবং হরিশ্চন্দ্রপুর থেকে মো. মতিউর রহমান।
এই তালিকায় আরও রয়েছেন—মালতিপুর থেকে আব্দুর রহিম বক্সি, মোথাবাড়ি থেকে ইসলাম মো. নজরুল, রঘুনাথগঞ্জ থেকে আখরুজ্জামান, লালগোলা থেকে ডক্টর আব্দুল আজিজ, ভগবানগোলা থেকে রেয়াত হোসেন সরকার, পলাশিপাড়া থেকে রুকবানুর রহমান, কালীগঞ্জ থেকে আলিফা আহমেদ, চাপড়া থেকে জেবের সেখ, বাদুড়িয়া থেকে বুরহানুল মুকাদ্দিম লিটন, আমডাঙা থেকে মোহাম্মদ কাসেম সিদ্দিকী, পাঁচলা থেকে গুলশান মল্লিক ইউনুস এবং মুরারই থেকে ড. মোশারফ হোসেন। অপরদিকে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আলোচনায় থাকা হুমায়ুন কবীর রেজিনগর ও নওদা—উভয় আসন থেকেই জয়লাভ করেছেন।
অন্যদিকে কংগ্রেসের টিকিটে এবার যে দুই প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, তারা দুজনেই মুসলিম সম্প্রদায়ের। এদের মধ্যে ফারাক্কা আসন থেকে মাহাতাব শেখ এবং রাণীনগর থেকে জুলফিকার আলি বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়া ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)-এর প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকী ভাঙড় আসন থেকে পুনরায় জয়ী হয়েছেন। বামফ্রন্টের একমাত্র মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে ডোমকল কেন্দ্র থেকে বিধানসভায় যাচ্ছেন মোস্তাফিজুর রহমান রানা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কাড়ছে অন্য এক সমীকরণ। এবারের নির্বাচনে বিজেপি ২০৬টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে চলেছে, যার মাধ্যমে অবসান ঘটছে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তৃণমূলের ভোটব্যাংকে ভাঙন এবং ভোট বিভাজনের কারণেই মূলত এই ফলাফল দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট এবার উল্লেখযোগ্য হারে মুসলিম প্রার্থী দেওয়ায় ভোট ভাগ হয়ে গেছে। তবে মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান অঞ্চলগুলোতে তৃণমূল সব আসন না পেলেও ৩০টির বেশি আসন নিজেদের কব্জায় রাখতে পেরেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, তৃণমূল এবার যে ৮০টি আসনে জিতেছে, তার মধ্যে ৭৩টি আসনেই সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, তৃণমূলের টিকে থাকার পেছনে এই সংখ্যালঘু ভোটাররাই বড় ভূমিকা রেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই ৭৩টি আসনে যদি সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশের নিচে থাকত, তবে তৃণমূলের আসন সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকত?
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করছে যে, তৃণমূলের জয়ের প্রধান শক্তি ছিল যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক, এবার বিজেপি তাতে বড় ধরণের থাবা বসালেও তা পুরোপুরি নিজেদের অনুকূলে নিতে পারেনি। তবে এই এলাকায় বিজেপির উত্থান চোখে পড়ার মতো। রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি—এমন ১৪৬টি আসনের মধ্যে তৃণমূল এবার পেয়েছে ৭৩টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে এই সংখ্যাটি ছিল ১২৯। অপরদিকে ওই ১৪৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি এবার ৬৬টি আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে, যা ২০২১ সালের ভোটে ছিল মাত্র ১৬টি। এছাড়া ৪০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে এমন ১৭টি আসনেও এবার গেরুয়া শিবির জয়ী হয়েছে, যেখানে ২০২১ সালে তারা জিতেছিল মাত্র দুটি আসনে।
(সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজার)