| ছবি: সংগৃহীত |
জাতীয় ডেস্ক | জনপ্রচার বাংলাদেশ
উচ্চ বেতনের চাকুরির প্রলোভনে পড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রে (ফ্রন্টলাইন) আটকে পড়া জামালপুরের দুই বাংলাদেশি তরুণ জীবিত অবস্থায় দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। ফ্রন্টলাইনের একটি অস্থায়ী আস্তানা থেকে গোপনে ধারণ করা তাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভিডিওতে নিজেদের বন্দিদশা ও যন্ত্রণার কথা তুলে ধরা ওই দুই যুবক হলেন—জামালপুর সদর উপজেলার গোদাশিমলা এলাকার আরমান আলী ও মাইনউদ্দিন। তারা অভিযোগ করেন, ড্রোন পরিচালনা কিংবা নির্মাণ সংস্থায় ভালো বেতনে কাজের কথা বলে দালালেরা তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর সামান্য কিছুদিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের সরাসরি যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে ঠেলে দেওয়া হয়।
ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে আরমান আলীকে বলতে শোনা যায়, "আমাদের বলা হয়েছিল ড্রোন কোম্পানি বা কনস্ট্রাকশন সাইটে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু এখানে এনে সরাসরি আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ১৬ জনের যে ক্যাম্প ছিল, তার মধ্যে ১২ জনই মারা গেছে। এখন আমরা মাত্র ৪ জন বেঁচে আছি, আর আমরা চারজনই গুরুতর আহত।"
আহত হওয়ার পরও তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে দাবি করে আরমান আরও বলেন, চিকিৎসার পর সুস্থ না হতেই তাদের আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। এতে রাজি না হওয়ায় তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকদিন একটি বাংকারে খাবার ও পানি ছাড়াই বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন ভারত !
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরমান বলেন, "আমরা এমন জীবন চাইনি। দেশে ছোটখাটো কাজ করে পরিবার নিয়ে কোনোমতে বাঁচতে চেয়েছিলাম। দেশে আমার পাঁচ মাসের একটা কন্যাসন্তান আছে। আমরা মুসলিম, আমাদের একমাত্র আকুতি—সরকার যেন আমাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে। আমরা দেশে গিয়ে মরতে চাই, যেন অন্তত জানাজাটা হয়। এভাবে এখানে শেয়াল-কুকুরের মতো মরতে চাই না। দয়া করে আমাদের বাঁচান।"
এদিকে ভিডিওটি সামনে আসার পর থেকে জামালপুরে আরমানের পরিবারে চরম উদ্বেগ ও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম জানান, দুদিন আগে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমরা রাশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু সেখান থেকে কোনো সাহায্য পাইনি। তারা বলছে, ছেলেরা নাকি নিজেদের ইচ্ছায় চুক্তিতে সই করেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমাদের ছেলেদের বন্দুকের মুখে জিম্মি করে ওই চুক্তিতে সই করানো হয়েছে।" সন্তানের এই পরিণতি জানার পর থেকে আরমানের মা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছেন এবং পুরো পরিবার মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আরমানের পাঁচ মাস বয়সী কন্যাসন্তানের নাম আরশি।
এই বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহবুবুল আলম সুমন জানান, তিনি ঘটনাটি জানতে পেরেছেন এবং খোঁজখবর নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে বিস্তারিত জানাবেন।
জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তার জানা নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করা হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আফসানা তাসলিম জানান, পরিবারটি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের কীভাবে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে।
ভিডিওটি নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই ফ্রন্টলাইন থেকে দুই বাংলাদেশিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সরকারের জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষ।