বিশ্বের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে যেসব দেশ

0

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | জনপ্রচার বাংলাদেশ


ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীর বুকে কোনো দেশের সীমানাই চিরস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয়। একসময়ের পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা যুগোস্লাভিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোও সময়ের আবর্তে একপর্যায়ে বিশ্ব মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে। যুগের সাথে সাথে বদলে গেছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, ভেঙেছে পুরোনো দীর্ঘদিনের ঐক্য এবং জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিবেশগত বিপর্যয় বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ ঠিক একই ধরনের অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল এবং তীব্র জাতিগত বিভাজনের কারণে এই দেশগুলোর ভবিষ্যৎ এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের নিচে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শঙ্কায় রয়েছে বিশ্বের বেশ কিছু দ্বীপরাষ্ট্র। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিরিবাতির মতো দেশগুলো সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মালদ্বীপের বিস্তীর্ণ নিচু অংশ ইতিমধ্যেই পানির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটি তাদের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিদেশে স্থায়ী জমি কেনার মতো বিকল্প পরিকল্পনাও হাতে নিচ্ছে। অন্যদিকে কিরিবাতির বেশ কিছু ছোট দ্বীপ ইতিমধ্যেই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং জোয়ারের লবণাক্ত পানি সুপেয় পানির প্রধান উৎসগুলো নষ্ট করে দেওয়ায় পুরো অঞ্চলটি ধীরে ধীরে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। প্রায় একই রকম ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে টুভালু; সেখানে নিয়মিত জোয়ারের পানিতে গ্রামগুলো প্লাবিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি এবং বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ছাড়ছে।

আরও পড়ুন: বিশ্বের মানচিত্র থেকে পাকিস্তানকে মুছে ফেলার হুঁশিয়ারি ভারতের

পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও জাতিগত ভাঙনের মুখে পড়েছে ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু পুরোনো রাষ্ট্র। উন্নত দেশ বেলজিয়ামে ভাষা ও সংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন দিন দিন প্রকট হচ্ছে। দেশটির ডাচভাষী ও ফরাসিভাষী অঞ্চলগুলো এখন প্রায় পৃথক দুটি দেশের মতো আচরণ করছে। অন্য দিকে বসনিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে কার্যত অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ চরম দুর্বল হয়ে পড়ায় এই দেশগুলোর ভৌগোলিক ঐক্য এখন সুতোয় ঝুলছে। সোমালিয়া ও হাইতির মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা এখন কেবল রাজধানী ও তার আশপাশের কিছু অংশে সীমিত হয়ে এসেছে, যার বাইরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।


এমনকি স্বাধীনতার দাবিতে খোদ ইউরোপের স্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলোও এখন অস্থির সময় পার করছে। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেনের অভ্যন্তরে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, যা ব্রেক্সিটের পর আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্পেনেও কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেশটির রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে টিকে আছে। এর বাইরেও ইরাক, সাইপ্রাস, মলদোভা এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, জাতিগত কোন্দল ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দেশগুলো হয়তো রাতারাতি হারিয়ে যাবে না, তবে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, জলবায়ুর চরম আঘাত এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণ মিলিয়ে আগামী কয়েক দশকে বিশ্ব মানচিত্রে যে এক বিশাল পরিবর্তন দেখা যাবে— ইতিহাস বারবার সেটিই প্রমাণ করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/popular/default