চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: শনাক্ত দুই অস্ত্রধারী

0

কিরিচ হাতে ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক | ছবি: সংগৃহীত


নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:


চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র হাতে থাকা দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংঘর্ষের সময় একজনের হাতে ছিল বড় কিরিচ এবং অন্যজন লাঠি হাতে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই ঘটনায় দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।


পুলিশ ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের সময় ধারালো কিরিচ হাতে থাকা ব্যক্তিটি হলেন চট্টগ্রাম মহানগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক। অন্যদিকে, নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে সিটি কলেজ অভিমুখে যাওয়া মিছিলে লাঠি হাতে দেখা গেছে মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইনকে। ছাদেক নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত। ফারুকের সরাসরি রাজনৈতিক পদ থাকলেও সাদেক হোসাইনের ফেসবুক প্রোফাইল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।


গত মঙ্গলবার সকালে সিটি কলেজের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ শব্দ মুছে দিয়ে ‘গুপ্ত’ লিখে দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এটি নিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দফায় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে। এতে ইট-পাটকেল ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে দুই সংগঠনের অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী আহত হন। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হন স্থানীয় একটি ওয়ার্ডের শিবির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম। ধারালো অস্ত্রের কোপে তাঁর একটি পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে গতকাল বিকেলে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।


অস্ত্র হাতে থাকার বিষয়টি নিয়ে নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম দাবি করেছেন, শিবির নেতা-কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আগে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, শিবিরের ফেলে যাওয়া কিরিচগুলো সরানোর সময় হয়তো মির্জা ফারুকের ছবি তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের আন্তর্জাতিক সম্পাদক সাদিক কায়েম এই হামলার জন্য সরাসরি ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে শিবিরের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া তামাকুমণ্ডি লেন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, ছাত্রদের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর এবং বিষয়টি নিয়ে তাঁরা সাংগঠনিকভাবে আলোচনা করবেন।


লাঠিসোটা হাতে জামায়াত সমর্থক ও ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ ছাদেক হোসাইন। ছবি: সংগৃহীত


চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অস্ত্রধারী ও দাঙ্গাকারীদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দোষীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। তবে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে উত্তেজনা না ছড়ায়, সেজন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।


দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে শিবির ও ছাত্রদল উভয়ই সেখানে সক্রিয় হয়। ক্যাম্পাসের একক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভই এই ভয়াবহ সংঘাতের নেপথ্য কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

Tags:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/popular/default